দ্বিতীয় অধ্যায়
সঞ্জয় উবাচ - তং তথা কৃপয়াবিষ্টমশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্ । বিষীদন্তমিদং বাক্যমুবাচ মধুসূদনঃ ।। ১
শ্রীভগবানুবাচ - কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্ । অনার্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্তিকরমর্জুন ।। ২
ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ নৈতৎ ত্বয্যুপপদ্যতে । ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ ।। ৩
অর্জুন উবাচ - কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণঞ্চ মধুসূদন । ইষুভিঃ প্রতিযোৎস্যামি পুজার্হাবরিসূদন ।। ৪
গুরূনহত্বা হি মহানুভাবান্ শ্রেয়ো ভোক্তুং ভৈক্ষ্যমপীহলোকে । হত্বার্থকামাংস্তু গুরূনিহৈব ভুঞ্জীয় ভোগান্ রুধিরপ্রদিগ্ধান্ ।। ৫
ন চৈতদ্বিদ্মঃ কতরন্নো গরীয়ো যদ্বা জয়েম যদি বা নো জয়েয়ুঃ । যানেব হত্বা ন জিজীবিষামস্তেহবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তরাষ্ট্রাঃ ।। ৬
কার্পণ্যদোষোপহতস্বভাবঃ পৃচ্ছামি ত্বাং ধর্মসংমূঢ়চেতাঃ । যচ্ছ্রেয়ঃ স্যান্নিশ্চিতং ব্রূহি তন্মে শিষ্যস্তেহহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্ ।। ৭
ন হি প্রপশ্যামি মমাপনুদ্যাদ্ যচ্ছোকমুচ্ছোষণমিন্দ্রিয়াণাম্ । অবাপ্য ভুমাবসপত্নমৃদ্ধং রাজ্যং সুরাণামপি চাধিপত্যম্ ।। ৮
সঞ্জয় উবাচ - এবমুক্ত্বা হৃষীকেশং গুড়াকেশঃ পরন্তপঃ । ন যোৎস্য ইতি গোবিন্দমুক্ত্বা তূষ্ণীং বভুব হ ।। ৯
তমুবাচ হৃষীকেশঃ প্রহসন্নিব ভারত । সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে বিষিদন্তমিদং বচঃ ।। ১০
শ্রীভগবানুবাচ - অশোচ্যানন্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে । গতাসূনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ ।। ১১
ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ । ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃপরম্ ।। ১২
দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা । তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি ।। ১৩
মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ । আগমাপায়িনোহনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত ।। ১৪
যং হি ন ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষর্ষভ । সমদুঃখসুখং ধীরং সোহমৃতত্বায় কল্পতে ।। ১৫
নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ । উভয়োরপি দৃষ্টোহন্তস্ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ ।। ১৬
অবিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্বমিদং ততম্ । বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কর্তুমর্হতি ।। ১৭
অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ । অনাশিনোহপ্রমেয়স্য তস্মাদ্ যুধ্যস্ব ভারত ।। ১৮
য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম্ । উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে ।। ১৯
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ নায়ং ভূত্বাহভবিতা বা ন ভূয়ঃ । অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ।। ২০
বেদাবিনাশিনং নিত্যং য এনমজমব্যয়ম্ । কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়তি হন্তি কম্ ।। ২১
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরাণি । তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ।। ২২
নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ । ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ।। ২৩
অচ্ছেদ্যোহয়মদাহ্যোহয়মক্লেদ্যোহশোষ্য এব চ । নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোহয়ং সনাতনঃ ।। ২৪
অব্যক্তোহয়মচিন্ত্যোহয়মবিকার্য্যোহয়মুচ্যতে । তস্মাদেবং বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুমর্হসি ।। ২৫
অথ চৈনং নিত্যজাতং নিত্যং বা মন্যসে মৃতম্ । তথাপি ত্বং মহাবাহো নৈনং শোচিতুমর্হসি ।। ২৬
জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ । তস্মাদপরিহার্যেহর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি ।। ২৭
অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত । অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা ।। ২৮
আশ্চর্যবৎ পশ্যতি কশ্চিদেনমাশ্চর্যবদ্ বদতি তথৈব চান্যঃ । আশ্চর্যবচ্চৈনমন্যঃ শৃণোতি শ্রুত্বাপ্যেনং বেদ ন চৈব কশ্চিৎ ।। ২৯
দেহী নিত্যমবধ্যোহয়ং দেহে সর্বস্য ভারত । তস্মাৎ সর্বাণি ভূতানি ন ত্বং শোচিতুমর্হসি ।। ৩০
স্বধর্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি । ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োহন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে ।। ৩১
যদৃচ্ছয়া চোপপন্নং স্বর্গদ্বারমপাবৃতম্ । সুখিনঃ ক্ষত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম্ ।। ৩২
অথ চেত্ত্বমিমং ধর্ম্যং সংগ্রামং ন করিষ্যসি । ততঃ স্বধর্মং কীর্তিং চ হিত্বা পাপমবাপ্স্যসি ।। ৩৩
অকীর্তিঞ্চাপি ভূতানি কথয়িষ্যন্তি তেহব্যয়াম্ । সম্ভাবিতস্য চাকীর্তির্মরণাদতিরিচ্যতে ।। ৩৪
ভয়াদ্রণাদুপরতং মংস্যন্তে ত্বাং মহারথাঃ । যেষাষ্ণ ত্বং বহুমতো ভূত্বা যাস্যসি লাঘবম্ ।। ৩৫
অবাচ্যবাদাংশ্চ বহূন্ বদিষ্যন্তি তবাহিতাঃ । নিন্দন্তস্তব সামর্থ্যং ততো দুঃখতরং নু কিম্ ।। ৩৬
হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্ । তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ ।। ৩৭
সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ৌ । ততো যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাপ্স্যসি ।। ৩৮
এষা তেহভিহিতা সাংখ্যে বুদ্ধির্যোগে ত্বিমাং শৃণু । বুদ্ধ্যা যুক্তো যয়া পার্থ কর্মবন্ধং প্রহাস্যসি ।। ৩৯
নেহাভিক্রমনাশোহস্তি প্রত্যবায়ো ন বিদ্যতে । স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ ।। ৪০
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিরেকেহ কুরুনন্দন । বহুশাখা হ্যনন্তাশ্চ বুদ্ধয়োহব্যবসায়িনাম্ ।। ৪১
যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ । বেদবাদরতাঃ পার্থ নান্যদস্তীতিবাদিনঃ ।। ৪২
কামাত্মানঃ স্বর্গপরা জন্মকর্মফলপ্রদাম্ । ক্রিয়াবিশেষবহুলাং ভোগৈর্শ্বযগতিং প্রতি ।। ৪৩
ভোগৈর্শ্বযপ্রসক্তানাং তয়াপহৃতচেতসাম্ । ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ সমাধৌ ন বিধীয়তে ।। ৪৪
ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভবার্জুন । নির্দ্বন্দ্বো নিত্যসত্ত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মবান্ ।। ৪৫
যাবানর্থ উদপানে সর্বতঃ সংপ্লুতোদকে । তাবান্ সর্বেষু বেদেষু ব্রাহ্মণস্য বিজানতঃ ।। ৪৬
কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন । মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি ।। ৪৭
যোগস্থঃ কুরু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয় । সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে ।। ৪৮
দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ্ধনঞ্জয় । বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ ।। ৪৯
বুদ্ধিযুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে । তস্মাদ্ যোগায় যুজ্যস্ব যোগঃ কর্মসু কৌশলম্ ।। ৫০
কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত্বা মনীষিণঃ । জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্ ।। ৫১
যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি । তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ ।। ৫২
শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা । সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি ।। ৫৩
অর্জুন উবাচ - স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা সমাধিস্থস্য কেশব । স্থিতধীঃ কিং প্রভাষেত কিমাসীত ব্রজেত কিম্ ।। ৫৪
শ্রীভগবানুবাচ - প্রজহাতি যদা কামান্ সর্বান্ পার্থ মনোগতান্ । আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে ।। ৫৫
দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ । বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে ।। ৫৬
যঃ সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্তৎ প্রাপ্য শুভাশুভম্ । নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ।। ৫৭
যদা সংহরতে চায়ং কুর্মোহঙ্গানীব সর্বশঃ । ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ।। ৫৮
বিষয়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ । রসবর্জং রসোহপ্যস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে ।। ৫৯
যততো হ্যপি কৌন্তেয় পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ । ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি হরন্তি প্রসভং মনঃ ।। ৬০
তানি সর্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ । বশে হি যস্যেন্দ্রিয়াণি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ।। ৬১
ধ্যায়তো বিষয়ান্ পুংসঃ সঙ্গস্তেষুপুজায়তে । সঙ্গাৎ সংজায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধোহভিজায়তে ।। ৬২
ক্রোধাদ্ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ । স্মৃতিভ্রংশাদ্ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি ।। ৬৩
রাগদ্বেষবিমুক্তৈস্তু বিষয়ানিন্দ্রিয়ৈশ্চরন্ । আত্মবশ্যৈর্বিধেয়াত্মা প্রসাদমধিগচ্ছতি ।। ৬৪
প্রসাদে সর্বদুঃখানাং হানিরস্যোপজায়তে । প্রসন্নচেতসো হ্যাশু বুদ্ধিঃ পর্যবতিষ্ঠতে ।। ৬৫
নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা । ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্ ।। ৬৬
ইন্দ্রিয়াণাং হি চরতাং যন্মনোহনুবিধীয়তে । তদস্য হরতি প্রজ্ঞাং বায়ুর্নাবমিবাম্ভসি ।। ৬৭
তস্মাদ্ যস্য মহাবাহো নিগৃহীতানি সর্বশঃ । ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ।। ৬৮
যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্তি সংযমী । যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতো মুনেঃ ।। ৬৯
আপূর্য্যমাণমচলপ্রতিষ্ঠং সমুদ্রমাপঃ প্রবিশন্তি যদ্বৎ । তদ্বৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্বে স শান্তিমাপ্নোতি ন কামকামী ।। ৭০
বিহায় কামান্ যঃ সর্বান্ পুমাংশ্চরতি নিঃস্পৃহঃ । নির্মমো নিরহঙ্কারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি ।। ৭১
এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ পার্থ নৈনাং প্রাপ্য বিমুহ্যতি । স্থিত্বাস্যামন্তকালেহপি ব্রহ্মনির্বাণমৃচ্ছতি ।। ৭২
বাংলা মিনিং
দ্বিতীয় অধ্যায়
সঞ্জয় কহিলেন - তখন মধুসূদন কৃপাবিষ্ট অশ্রুপূর্ণলোচন বিষন্ন অর্জুনকে এই কথা বলিলেন । ১
শ্রীভগবান্ বলিলেন - হে অর্জুন ! এই সঙ্কটসময়ে অনার্য-জনোচিত, স্বর্গহানিকর, অকীর্তিকর তোমার এই মোহ কোথা হইতে উপস্থিত হইল ? ২
হে পার্থ, কাতর হইও না । এইরূপ পৌরুষহীনতা তোমাকে শোভা পায় না । হে পরন্তপ ! তুচ্ছ হৃদয়ের দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া (যুদ্ধার্থে) উত্থিত হও । ৩
অর্জুন বলিলেন - হে শত্রুমর্দন মধুসূদন, আমি যুদ্ধকালে পূজনীয় ভীষ্ম ও দ্রোণের সহিত কিরূপে বাণের দ্বারা প্রতিযুদ্ধ করিব ? (অর্থাৎ) তাঁহারা আমার শরীরে বাণ নিক্ষেপ করিলেও আমি গুরুজনের অঙ্গে অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে পারিব না । ৪
মহানুভব গুরুজনদিগকে বধ না করিয়া ইহলোকে ভিক্ষান্ন-ভোজন করাও শ্রেয়ঃ । কেননা গুরুজনদিগকে বধ করিয়া ইহলোকে যে অর্থকাম ভোগ করিব তাহা তো (গুরুজনের) রুধির-লিপ্ত । ৫
আমরা জয়ী হই অথবা আমাদিগকে ইহারা জয় করুক, এই উভয়ের মধ্যে কোন্টি শ্রেয়স্কর তাহা বুঝিতে পারিতেছি না, - যাহাদিগকে বধ করিয়া বাঁচিয়া থাকিতে চাহি না, সেই ধৃতরাষ্ট্র-পুত্রগণ সম্মুখে অবস্থিত । ৬
(গুরুজনদিগকে বধ করিয়া কিরূপে প্রাণ ধারণ করিব এইরূপ চিন্তাপ্রযুক্ত) চিত্তের দীনতায় আমি অভিভূত হইয়াছি; প্রকৃত ধর্ম কি এ সন্বন্ধে আমার চিত্ত বিমূঢ় হইয়াছে; যাহা আমার ভাল হয়, আমাকে নিশ্চিত করিয়া তাহা বল, আমি তোমার শিষ্য, তোমার শরণাপন্ন, আমাকে উপদেশ দাও । (আমাকে আর তুমি সখা বলিয়া মনে করিও না, আমি তোমার শিষ্য) । ৭
পৃথিবীতে নিষ্কন্টক সমৃদ্ধ রাজ্য এবং সুরলোকের আধিপত্য পাইলেও যে শোক আমার ইন্দ্রিয়গণকে বিশোষণ করিবে তাহা কিসে যাইবে, আমি দেখিতেছি না । ৮
সঞ্জয় কহিলেন - শত্রুতাপন অর্জুন হৃষীকেশ গোবিন্দকে এইরূপ বলিয়া 'আমি যুদ্ধ করিব না' এই কথা কহিয়া তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন (নীরব রহিলেন) । ৯
হে ভারত (ধৃতরাষ্ট্র) ! হৃষীকেশ উভয় সেনার মধ্যে বিষাদপ্রাপ্ত অর্জুনকে হাসিয়া এই কথা বলিলেন । ১০
শ্রীভগবান্ বলিলেন - যাহাদিগের জন্য শোক করার কোন কারণ নাই, তুমি তাহাদিগের জন্য শোক করিতেছ, আবার পণ্ডিতের ন্যায় কথা বলিতেছ । কিন্তু যাঁহারা প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানী তাঁহারা কি মৃত কি জীবিত, কাহারো জন্য শোক করেন না । ১১
আমি পূর্বে ছিলাম না, বা তুমি ছিলে না বা এই নৃপতিগণ ছিলেন না, এমন নহে (অর্থাৎ সকলেই ছিলাম) । আর, পরে আমরা সকলে থাকিব না তাহাও নহে (অর্থাৎ পরেও সকলে থাকিব) । ১২
জীবের এই দেহে বাল্য, যৌবন ও বার্ধক্য, কালের গতিতে উপস্থিত হয় । তেমনি কালের গতিতে দেহান্তর-প্রাপ্তিও হয় । জ্ঞানিগণ তাহাতে মোহগ্রস্ত হন না । ১৩
হে কৌন্তেয়, ইন্দ্রিয়বৃত্তির সহিত বিষয়াদির সংযোগই শীতোষ্ণাদি সুখদুঃখ প্রদান করে । সেগুলির একবার উৎপত্তি হয়, আবার বিনাশ হয়, সুতরাং ওগুলি অনিত্য । অতএব সে সকল সহ্য কর । ১৪
হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, যে স্থিরবুদ্ধি ব্যক্তি এই সকল বিষয়স্পর্শ-জনিত সুখদুঃখ সমভাবে গ্রহণ করেন, উহাতে বিচলিত হন না, তিনি অমৃতত্ব লাভে সমর্থ হন । ১৫
অসৎ বস্তুর ভাব (সত্তা, স্থায়িত্ব) নাই, সৎবস্তুর অভাব (নাশ) নাই; তত্ত্বদর্শিগণ এই সদসৎ উভয়েরই চরম দর্শন করিয়াছেন (স্বরূপ উপলব্ধি করিয়াছেন) । ১৬
যিনি এই সকল (দৃশ্য জগৎ) ব্যাপিয়া আছেন তাঁহাকে অবিনাশী জানিও । কেহই এই অব্যয় স্বরূপের বিনাশ করিতে পারে না । ১৭
দেহাশ্রিত আত্মার এই সকল দেহ নশ্বর বলিয়া উক্ত হইয়াছে । কিন্তু আত্মা নিত্য, অবিনাশী, অপ্রমেয় (স্বপ্রকাশ) । অতএব, হে অর্জুন, যুদ্ধ কর (আত্মার অবিনাশিতা ও দেহাদির নশ্বরত্ব স্মরণ করিয়া কাতরতা ত্যাগ কর । স্বধর্ম পালন কর) । ১৮
যে আত্মাকে হন্তা বলিয়া জানে এবং যে উহাকে হত বলিয়া মনে করে, তাহারা উভয়েই আত্মতত্ত্ব জানে না । ইনি হত্যা করেন না, হতও হন না । ১৯
এই আত্মা কখনো জন্মেন না বা মরেন না । ইনি অন্যান্য জাত বস্তুর ন্যায় জন্মিয়া অস্তিত্ব লাভ করেন না অর্থাৎ ইনি সৎরূপে নিত্য বিদ্যমান । ইনি জন্মরহিত, নিত্য, শাশ্বত এবং পুরাণ; শরীর হত হইলেও ইনি হত হন না । ২০
যিনি আত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, অজ, অব্যয় বলিয়া জানেন, হে পার্থ, সে পুরুষ কি প্রকারে কাহাকে হত্যা করেন বা করান ? ২১
যেমন মনুষ্য জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া নূতন বস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ আত্মা জীর্ণ শরীর পরিত্যাগ করিয়া অন্য নূতন শরীর পরিগ্রহ করে । ২২
শস্ত্রসকল ইহাকে ছেদন করিতে পারে না, অগ্নিতে দহন করিতে পারে না, জলে ভিজাইতে পারে না, বায়ুতে শুষ্ক করিতে পারে না । ২৩
এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, অশোষ্য । ইনি নিত্য, সর্বব্যাপী, স্থির, অচল, সনাতন, অব্যক্ত, অচিন্ত্য, অবিকার্য্য বলিয়া কথিত হন । ২৪
অতএব আত্মাকে এই প্রকার জানিয়া তোমার শোক করে উচিত নয় । ২৫
আর যদি তুমি মনে কর যে, আত্মা সর্বদা দেহের সঙ্গে জন্মে এবং দেহের সঙ্গেই বিনষ্ট হয়, তথাপি, হে মহাবাহো, তোমার শোক করা উচিত নয় । (দেহনাশে আত্মারও নাশ হয় ইহা স্বীকার করিয়া লইলেও শোক করা উচিত নয় । কেননা, জন্মমৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ।) ২৬
যে জন্মে তার মরণ নিশ্চিত, যে মরে তার জন্ম নিশ্চিত; সুতরাং অবশ্যম্ভাবী বিষয়ে তোমার শোক করা উচিত নয় । ২৭
হে ভারত (অর্জুন) ! জীবগণ আদিতে অব্যক্ত, মধ্যে ব্যক্ত এবং বিনাশান্তে অব্যক্ত থাকে । তাহাতে শোক বিলাপ কি ? ২৮
কেহ আত্মাকে আশ্চর্য্যবৎ কিছু বলিয়া বোধ করেন, কেহ ইহাকে আশ্চর্য্যবৎ কিছু বলিয়া বর্ণনা করেন, কেহ বা ইনি আশ্চর্য্যবৎ কিছু, এই প্রকার কথাই শুনেন । কিন্তু শুনিয়াও কেহ ইহাকে জানিতে পারেন না । ২৯
হে ভারত, জীবসকলের দেহে আত্মা সর্বদাই অবধ্য, অতএব কোন প্রাণীর জন্যই তোমার শোক করা উচিত নহে । ৩০
স্বধর্মের দিকে দৃষ্টি রাখিয়াও তোমার ভীত-কম্পিত হয়া উচিত নহে । ধর্মযুদ্ধ অপেক্ষা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে শ্রেয়ঃ আর কিছু নাই । ৩১
হে পার্থ, এই যুদ্ধ আপনা হইতেই উপস্থিত হইয়াছে, ইহা মুক্ত স্বর্গদ্বার স্বরূপ । ভাগ্যবান্ ক্ষত্রিয়েরাই ঈদৃশ যুদ্ধ লাভ করিয়া থাকেন । ৩২
আর যদি তুমি ধর্মযুদ্ধ না কর তবে স্বধর্ম ও কীর্তি ত্যাগ করিয়া তুমি পাপযুক্ত হইবে । ৩৩
আরও দেখ, সকল লোকে চিরকাল তোমার অকীর্তি ঘোষণা করিবে । সম্মানিত ব্যক্তির পক্ষে অকীর্তি মরণ অপেক্ষা অধিক, অর্থাৎ অকীর্তি অপেক্ষা মরণও শ্রেয়ঃ । ৩৪
মহারথগণ মনে করিবেন, তুমি ভয়বশতঃ যুদ্ধে বিরত হইতেছ, দয়াবশতঃ নহে । সুতরাং যাহারা তোমাকে বহু সম্মান করেন তাহাদিগের নিকট তুমি লঘুতা প্রাপ্ত হইবে । ৩৫ তোমার শত্রুরাও তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করিয়া অনেক অবাচ্য কথা বলিবে; তাহা অপেক্ষা অধিক দুঃখকর আর কি আছে ? ৩৬
যুদ্ধে হত হইলে স্বর্গ পাইবে, জয়লাভ করিলে পৃথিবী ভোগ করিবে, সুতরাং হে কৌন্তেয়, যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া উত্থান কর । ৩৭
অতএব, সুখদুঃখ, লাভ-অলাভ, জয়-পরাজয় তুল্যজ্ঞান করিয়া যুদ্ধার্থ উদ্যুক্ত (উদ্যত) হও । এইরূপ করিলে পাপভাগী হইবে না । ৩৮
হে পার্থ, তোমাকে এতক্ষণ সাংখ্য নিষ্ঠা-বিষয়ক জ্ঞান উপদেশ দিলাম, এক্ষণ যোগবিষয়ক জ্ঞান শ্রবণ কর (যাহা এক্ষণ বলিতেছি) এই জ্ঞান লাভ করিলে কর্মবন্ধন ত্যাগ করিতে পারিবে । ৩৯
ইহাতে (এই নিষ্কাম কর্মযোগে) আরব্ধ কর্ম নিষ্ফল হয় না এবং (ত্রুটি-বিচ্যুতি-জনিত) পাপ বা বিঘ্ন হয় না, এই ধর্মের অল্প আচরণও মহাভয় হইতে ত্রাণ করে । ৪০
ইহাতে (এই নিষ্কাম কর্মযোগে) ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি (নিষ্কাম ভাবে কর্ম করিয়াই আমি ত্রাণ পাইব এইরূপ নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি) একই হয় অর্থাৎ একনিষ্ঠই থাকে, নানাদিকে ধাবিত হয় না । কিন্তু অব্যবসায়ীদিগের (অস্থিরচিত্ত সকাম ব্যক্তিগণের) বুদ্ধি বহুশাখাবিশিষ্ট ও অনন্ত (সুতরাং নানাদিকে ধাবিত হয়) । ৪১
হে পার্থ, অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিগণ বেদের কর্মকাণ্ডের স্বর্গফলাদি প্রকাশক প্রীতিকর বাক্যে অনুরক্ত, তাহারা বলে বেদোক্ত কাম্যকর্মাত্মক ধর্ম ভিন্ন আর কিছু ধর্ম নাই, তাহাদের চিত্ত কামনা-কলুষিত, স্বর্গই তাহাদের পরম পুরুষার্থ, তাহারা ভোগৈশ্বর্য্য লাভের উপায়স্বরূপ বিবিধ ক্রিয়াকলাপের প্রশংসাসূচক আপাতোমনোরম বেদবাক্য বলিয়া থাকে; এই সকল শ্রবণ-রমণীয় বাক্যদ্বারা অপহৃতচিত্ত, ভোগৈশ্বর্য্যে আসক্ত ব্যক্তিগণের কার্যাকার্য নির্ণায়ক বুদ্ধি এক বিষয়ে স্থির থাকিতে পারে না (ঈশ্বরে একনিষ্ঠ হয় না) । ৪২, ৪৩, ৪৪
হে অর্জুন, বেদসমূহ ত্রৈগুণ্য-বিষয়ক, তুমি নিস্ত্রৈগুণ্য হও - তুমি নির্দ্বন্দ্ব, নিত্যসত্ত্বস্থ, যোগ-ক্ষেমরহিত ও আত্মবান্ হও । ৪৫
বাপী-কূপ-তড়াগাদি ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র জলাশয়ে যে প্রয়োজন সিদ্ধ হয়, এক বিস্তীর্ণ মহাজলাশয়ে সেই সমস্তই সিদ্ধ হয়; সেইরূপ বেদোক্ত কাম্যকর্মসমূহে যে ফল লাভ হয়, ব্রহ্মবেত্তা ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষের সেই সমস্তই লাভ হয় । ৪৬
কর্মেই তোমার অধিকার, কর্মফলে কখনও তোমার অধিকার নাই । কর্মফল যেন তোমার কর্মপ্রবৃত্তির হেতু না হয় কর্মত্যাগেও যেন তোমার প্রবৃত্তি না হয় । ৪৭
হে ধনঞ্জয়, যোগস্থঃ হইয়া, ফলাসক্তি বর্জন করিয়া, সিদ্ধি ও অসিদ্ধি তুল্যজ্ঞান করিয়া তুমি কর্ম কর । এইরূপ সমত্ব-বুদ্ধিকেই যোগ কহে । ৪৮
হে ধনঞ্জয়, কেবল বাহ্য কর্ম বুদ্ধিযোগ অপেক্ষা নিতান্তই নিকৃষ্ট; অতএব তুমি সমত্ববুদ্ধির আশ্রয় লও; যাহারা ফলের উদ্দেশে কর্ম করে, তাহার দীন, কৃপার পাত্র । ৪৯
সমত্ববুদ্ধিযুক্ত নিষ্কাম কর্মী ইহলোকেই সুকৃত দুষ্কৃত উভয়ই ত্যাগ করেন । সুতরাং তুমি যোগের অনুষ্ঠান কর; কর্মে কৌশলই যোগ । ৫০
সমত্ববুদ্ধিযুক্ত জ্ঞানিগণ কর্ম করিলেও কর্মজনিত ফলে আবদ্ধ হন না, সুতরাং তাঁহারা জন্মরূপ বন্ধন অর্থাৎ সংসার বন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া সর্বপ্রকার উপদ্রবরহিত বিষ্ণুপদ বা মোক্ষপদ প্রাপ্ত হন । ৫১
যখন তোমার বুদ্ধি মোহরূপ গহনকানন অতিক্রম করিবে, তখন তুমি শ্রুত ও শ্রোতব্য বিষয়ে বৈরাগ্য প্রাপ্ত হইবে । ৫২
লৌকিক ও বৈদিক নানাবিধ ফলকথা শ্রবণে বিক্ষিপ্ত তোমার বুদ্ধি যখন সমাধিতে নিশ্চল হইয়া থাকিবে তখন তুমি (সাম্যবুদ্ধিরূপ) যোগ প্রাপ্ত হইবে । ৫৩
অর্জুন কহিলেন - হে কেশব, যিনি সমাধিস্থ হইয়া স্থিতপ্রজ্ঞ হইয়াছেন তাঁহার লক্ষণ কি ? স্থিতধী ব্যক্তি কিরূপ কথা বলেন ? কিরূপে অবস্থান করেন ? কিরূপে চলেন ? ৫৪
শ্রীভগবান্ বলিলেন - হে পার্থ, যখন কেহ সমস্ত মনোগত কামনা বর্জন করিয়া আপনাতেই আপনি তুষ্ট থাকেন, তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ বলিয়া কথিত হন । ৫৫
যিনি দুঃখে উদ্বেগশূন্য, সুখে স্পৃহাশূন্য, যাঁহার অনুরাগ, ভয় এবং ক্রোধ নিবৃত্ত হইয়াছে, তাঁহাকে স্থিতপ্রজ্ঞ মুনি বলা যায় । ৫৬
যিনি দেহ-জীবনাদি সকল বিষয়েই শুভ প্রাপ্তিতে সন্তোষ বা অশুভ প্রাপ্তিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন না, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ । ৫৭
কচ্ছপ যেমন কর-চরণাদি অঙ্গসকল সঙ্কুচিত করিয়া রাখে, তেমনি যিনি রূপরসাদি ইন্দ্রিয়ের বিষয় হইতে ইন্দ্রিয়সকল সংহরণ করিয়া লন, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ । ৫৮
ইন্দ্রিয়দ্বারা বিষয়গ্রহণে অপ্রবৃত্ত ব্যক্তির বিষয়োপভোগ নিবৃত্ত হয় বটে, কিন্তু বিষয়-তৃষ্ণা নিবৃত্ত হয় না । কিন্তু সেই পরম পুরুষকে দেখিয়া স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির বিষয়-বাসনাও নিবৃত্ত হয় । ৫৯
হে কৌন্তেয়, প্রমাথী ইন্দ্রিয়গণ সংযমে যত্নশীল, বিবেকী পুরুষেরও চিত্তকে বলপূর্বক হরণ করে (বিষয়াসক্ত করে) । ৬০
যিনি আমার অনন্যভক্ত তিনি সেই সকল ইন্দ্রিয়কে সংযত করিয়া আমাকে চিত্ত সমাহিত করিয়া অবস্থান করেন । তাদৃশ সমাহিতচিত্ত ব্যক্তিরই ইন্দ্রিয়-সকল বশীভূত হয়, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ । ৬১
বিষয়-চিন্তা করিতে করিতে মনুষ্যের তাহাতে আসক্তি জন্মে, আসক্তি হইতে কামনা অর্থাৎ সেই বিষয় লাভের অভিলাষ জন্মে, সেই কামনা কোন কারণে প্রতিহত বা বাধা প্রাপ্ত হইলে প্রতিবোধকের প্রতি ক্রোধ জন্মে, ক্রোধ হইতে মোহ, মোহ হইতে স্মৃতিভ্রংশ, স্মৃতিভ্রংশ হইতে বুদ্ধিনাশ, বুদ্ধিনাশ হইতে বিনাশ ঘটে । ৬২-৬৩
কিন্তু যিনি বিধেয়াত্মা অর্থাৎ যাহার মন নিজের বশবর্তী, তিনি অনুরাগ ও বিদ্বেষ হইতে বিমুক্ত, আত্মবশীভূত ইন্দ্রিয়গণদ্বারা বিষয় উপভোগ করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করেন । ৬৪
চিত্তপ্রসাদ জন্মিলে এই পুরুষের সমস্ত দুঃখের নিবৃত্তি হয়, যেহেতু প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তির বুদ্ধি শীঘ্র উপাস্য বস্তুতে স্থিতি লাভ করে । ৬৫
যিনি অযুক্ত অর্থাৎ যাঁহার চিত্ত অসমাহিত ও ইন্দ্রিয় অবশীকৃত, তাঁহার আত্ম-বিষয়া বুদ্ধিও হয় না, চিন্তাও হয় না । (যাঁহার আত্ম-বিষয়া) চিন্তা নাই, তাঁহার শান্তি নাই, যাঁহার শান্তি নাই, তাঁহার সুখ কোথায় ? ৬৬
মন বিষয়ে প্রবর্তমান ইন্দ্রিয়গণের যেটিকে অনুবর্তন করে, সেই একটি ইন্দ্রিয়ই, যেমন বায়ু জলের উপরিস্থিত নৌকাকে বিচলিত করে, তদ্রূপ উহার প্রজ্ঞা হরণ করে । ৬৭
হে মহাবাহু ! (যখন ইন্দ্রয়াধীন মন এবং মনের অধীন প্রজ্ঞা) সেই হেতু, যাহার ইন্দ্রিয় সর্বপ্রকারে বিষয় হইতে নিবৃত্ত হইয়াছে, তাহারই প্রজ্ঞা স্থির হইয়াছে । ৬৮
সাধারণ প্রাণিগণের পক্ষে যাহা (আত্মনিষ্ঠা) নিশাস্বরূপ, তাহাতে (আত্মনিষ্ঠাতে) সংযমী ব্যক্তি জাগ্রত থাকেন; যাহাতে (বিষয়নিষ্ঠাতে) অজ্ঞ প্রাণিসাধারণ জাগরিত থাকে, আত্মদর্শী মুনিদিগের তাহা (বিষয়নিষ্ঠা) রাত্রিস্বরূপ । ৬৯
যেমন নদ-নদীর জলে পরিপূরিত প্রশান্ত সমুদ্রে অপর জলরাশি আসিয়া প্রবেশ করিয়া বিলীন হইয়া যায়, সেইরূপ যে মহাত্মাতে বিষয় সকল প্রবেশ করিয়াও কোনরূপ চিত্তবিক্ষেপ উৎপন্ন করে না, তিনি শান্তিলাভ করেন; যিনি ভোগ কামনা করেন, তিনি শান্তি পান না । ৭০
যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা ত্যাগ করিয়া নিস্পৃহ হইয়া বিচরণ করেন, যিনি মমতাশূন্য ও অহঙ্কারশূন্য, তিনিই শান্তিপ্রাপ্ত হন । ৭১
হে পার্থ, ইহাই ব্রাহ্মীস্থিতি (ব্রহ্মজ্ঞানে অবস্থান)
Posted by KothaBD.xyz

0 comments:
Post a Comment