একাদশ অধ্যায়

অর্জুন উবাচ - মদনুগ্রহায় পরমং গুহ্যমধ্যাত্মসংজ্ঞিতম্ । যৎ ত্বয়োক্তং বচস্তেন মোহোহয়ং বিগতো মম ।। ১

ভবাপ্যয়ৌ হি ভূতানাং শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া । ত্বত্তঃ কমলপত্রাক্ষ মাহাত্ম্যমপি চাব্যয়ম্ ।। ২

এবমেতদ্ যথাত্থ ত্বমাত্মানং পরমেশ্বর । দ্রষ্টুমিচ্ছামি তে রূপমৈশ্বরং পুরুষোত্তম ।। ৩

মন্যসে যদি তচ্ছক্যং ময়া দ্রষ্টুমিতি প্রভো । যোগেশ্বর ততো মে ত্বং দর্শয়াত্মানমব্যয়ম্ ।। ৪

শ্রীভগবানুবাচ - পশ্য মে পার্থ রূপাণি শতশোহথ সহস্রশঃ । নানাবিধানি দিব্যানি নানাবর্ণাকৃতীনি চ ।। ৫

পশ্যাদিত্যান্ বসূন্ রুদ্রানশ্বিনৌ মরুতস্তথা । বহুন্যদৃষ্টপূর্বাণি পশ্যাশ্চর্যাণি ভারত ।। ৬

ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্ । মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান্যদ্ দ্রষ্টুমিচ্ছসি ।। ৭

ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুস্মনেনৈব স্বচক্ষুষা । দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্ ।। ৮

সঞ্জয় উবাচ - এবমুক্ত্বা ততো রাজন্ মহাযোগেশ্বরো হরিঃ । দর্শয়ামাস পার্থায় পরমং রূপমৈশ্বরম্ ।। ৯

অনেকবক্ত্রনয়নমনেকাদ্ভুতদর্শনম্ । অনেকদিব্যাভরণং দিব্যানেকোদ্যতায়ুধম্ ।। ১০

দিব্যমাল্যান্বরধরং দিব্যগন্ধানুলেপনম্ । সর্বাশ্চর্যময়ং দেবমনন্তং বিশ্বতোমুখম্ ।। ১১

দিবি সূর্যসহস্রস্য ভবেদ্ যুগপদুত্থিতা । যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাদ্ ভাসস্তস্য মহাত্মনঃ ।। ১২

তত্রৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তমনেকধা । অপশ্যদ্দেবদেবস্য শরীরে পাণ্ডবস্তদা ।। ১৩

ততঃ স বিস্ময়াবিষ্টো হৃষ্টরোমা ধনঞ্জয়ঃ । প্রণম্য শিরসা দেবং কৃতাঞ্জলিরভাষত ।। ১৪

অর্জুন উবাচ - পশ্যামি দেবাংস্তব দেব দেহে সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসঙ্ঘান্। ব্রহ্মাণমীশং কমলাসনস্থমৃষীংশ্চ সর্বানুরগাংশ্চ দিব্যান্ ।। ১৫

অনেকবাহূদরবক্ত্রনেত্রং পশ্যামি ত্বাং সর্বতোহনন্তরূপম্ । নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিং পশ্যামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ ।। ১৬

কিরীটিনং গদিনং চক্রিণঞ্চ তেজোরাশিং সর্বতো দীপ্তিমন্তম্ । পশ্যামি ত্বাং দুর্নিরীক্ষ্যং সমন্তাদ্ দীপ্তানলার্কদ্যুতিমপ্রমেয়ম্ ।। ১৭

ত্বমক্ষরং পরমং বেদিতব্যং ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্ । ত্বমব্যয়ঃ শাশ্বতধর্মগোপ্তা সনাতনস্ত্বং পুরুষো মতো মে ।। ১৮

অনাদিমধ্যান্তমনন্তবীর্য্যম্‌ অনন্তবাহুং শশিসূর্যনেত্রম্ । পশ্যামি ত্বাং দীপ্তহুতাশবক্ত্রং স্বতেজসা বিশ্বমিদং তপন্তম্ ।। ১৯

দ্যাবাপৃথিব্যোরিদমন্তরং হি ব্যাপ্তং ত্বয়ৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ । দৃষ্ট্বাদ্ভুতং রূপমুগ্রং তবেদং লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন্ ।। ২০

অমী হি ত্বাং সুরসঙ্ঘা বিশন্তি কেচিদ্ভীতাঃ প্রাঞ্জলয়ো গৃণন্তি । স্বস্তীত্যুক্ত্বা মহর্ষিসিদ্ধসঙ্ঘাঃ স্তুবন্তি ত্বাং স্তুতিভিঃ পুষ্কলাভিঃ ।। ২১

রুদ্রাদিত্যা বসবো যে চ সাধ্যা বিশ্বেহশ্বিনৌ মরুতশ্চোষ্মপাশ্চ । গন্ধর্বযক্ষাসুরসিদ্ধসঙ্ঘা বীক্ষন্তে ত্বাং বিস্মিতাশ্চৈব সর্বে ।। ২২

রূপং মহত্তে বহুবক্ত্রনেত্রং মহাবাহো বহুবাহূরূপাদম্ । বহূদরং বহুদংষ্ট্রাকরালং দৃষ্ট্বা লোকাঃ প্রব্যথিতাস্তথাহম্ ।। ২৩

নভঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণং ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্ । দৃষ্ট্বা হি ত্বাং প্রব্যথিতান্তরাত্মা ধৃতিং ন বিন্দামি শমঞ্চ বিষ্ণো ।। ২৪

দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি দৃষ্ট্বৈব কালানলসন্নিভানি । দিশো ন জানে ন লভে চ শর্ম প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস ।। ২৫

অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ সর্বে সহৈবাবনিপালসঙ্ঘৈঃ । ভীষ্মো দ্রোণঃ সূতপুত্রস্তথাসৌ সহাস্মদীয়ৈরপি যোধমুখ্যৈঃ ।। ২৬

বক্ত্রাণি তে ত্বরমাণা বিশন্তি দংষ্ট্রাকরালানি ভয়ানকানি । কেচিদ্বিলগ্না দশনান্তরেষু সংদৃশ্যন্তে চুর্ণিতৈরুত্তমাঙ্গৈঃ ।। ২৭

যথা নদীনাং বহবোহন্বুবেগাঃ সমুদ্রমেবাভিমুখা দ্রবন্তি । তথা তবামী নরলোকবীরাঃ বিশন্তি বক্ত্রাণ্যভিবিজ্বলন্তি ।। ২৮

যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধবেগাঃ । তথৈব নাশায় বিশন্তি লোকান্তবাপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ ।। ২৯

লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাল্লোকান্ সমগ্রান্ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ । তেজোভিরাপূর্য্য জগৎ সমগ্রং ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো ।। ৩০

আখ্যাহি মে কো ভবানুগ্ররূপো নমোহস্তু তে দেববর প্রসীদ । বিজ্ঞাতুমিচ্ছামি ভবন্তমাদ্যং ন হি প্রজানামি তব প্রবৃত্তিম্ ।। ৩১

শ্রীভগবানুবাচ - কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো লোকান্ সমাহর্তুমিহ প্রবৃত্তঃ । ঋতেহপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে যেহবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যোধাঃ ।।৩২

তস্মাৎ ত্বমুত্তিষ্ঠ যশো লভস্ব জিত্বা শত্রূন্ ভুঙ্‌ক্ষ্ব রাজ্যং সমৃদ্ধম্ । ময়ৈবৈতে নিহতাঃ পূর্বমেব নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্ ।। ৩৩

দ্রোণঞ্চ ভীষ্মঞ্চ জয়দ্রথঞ্চ কর্ণং তথান্যানপি যোধবীরান্ । ময়া হতাংস্ত্বং জহি মা ব্যথিষ্ঠাঃ যুধ্যস্ব জেতাসি রণে সপত্নান্ ।। ৩৪

সঞ্জয় উবাচ - এতচ্ছ্রুত্বা বচনং কেশবস্য কৃতাঞ্জলির্বেপমানঃ কিরীটী । নমস্কৃত্বা ভূয় এবাহ কৃষ্ণং সগদ্‌গদং ভীতভীতঃ প্রণম্য ।। ৩৫

অর্জুন উবাচ - স্থানে হৃষীকেশ তব প্রকীর্ত্যা জগৎ প্রহৃষ্যত্যনুরজ্যতে চ । রক্ষাংসি ভীতানি দিশো দ্রবন্তি সর্বে নমস্যন্তি চ সিদ্ধসঙ্ঘাঃ ।। ৩৬

কস্মাচ্চ তে ন নমেরন্ মহাত্মন্ গরীয়সে ব্রহ্মণোহপ্যাদিকর্ত্রে । অনন্ত দেবেশ জগন্নিবাস ত্বমক্ষরং সদসৎ তৎ পরং যৎ ।। ৩৭

ত্বমাদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণস্ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্ । বেত্তাসি বেদ্যঞ্চ পরঞ্চ ধাম ত্বয়া ততং বিশ্বমনন্তরূপ ।। ৩৮

বায়ুর্যমোহগ্নির্বরুণঃ শশাঙ্ক প্রজাপতিস্ত্বং প্রপিতামহশ্চ । নমো নমস্তেহস্তু সহস্রকৃত্বঃ পুনশ্চ ভূয়োহপি নমো নমস্তে ।। ৩৯

নমঃ পুরস্তাদথ পৃষ্ঠতস্তে নমোহস্তু তে সর্বত এব সর্ব । অনন্তবীর্যামিতবিক্রমস্ত্বং সর্বং সমাপ্নোষি ততোহসি সর্বঃ ।। ৪০

সখেতি মত্বা প্রসভং যদুক্তং হে কৃষ্ণ হে যাদব হে সখেতি । অজানতা মহিমানং তবেদং ময়া প্রমাদাৎ প্রণয়েন বাপি ।। ৪১

যচ্চাবহাসার্থমসৎকৃতোহসি বিহারশয্যাসনভোজনেষু । একোহথবাপ্যচ্যুত তৎসমক্ষং তৎ ক্ষাময়ে ত্বামহমপ্রমেয়ম্ ।। ৪২

পিতাসি লোকস্য চরাচরস্য ত্বমস্য পূজ্যশ্চ গুরুর্গরীয়ান্ । ন ত্বৎসমোহস্ত্যভ্যধিকঃ কুতোহন্যো লোকত্রয়েহপ্যপ্রতিমপ্রভাব ।। ৪৩

তস্মাৎ প্রণম্য প্রণিধায় কায়ং প্রসাদয়ে ত্বামহমীশমীড্যম্ । পিতেব পুত্রস্য সখেব সখ্যুঃ প্রিয়ঃ প্রিয়ায়ার্হসি দেব সোঢ়ুম্ ।। ৪৪

অদৃষ্টপূর্বং হৃষিতোহস্মি দৃষ্ট্বা ভয়েন চ প্রব্যথিতং মনো মে । তদেব মে দর্শয় দেব রূপং প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস ।। ৪৫

কিরীটিনং গদিনং চক্রহস্তমিচ্ছামি ত্বাং দ্রষ্টুমহং তথৈব । তেনৈব রূপেণ চতুর্ভুজেন সহস্রবাহো ভব বিশ্বমূর্তে ।। ৪৬

শ্রীভগবানুবাচ - ময়া প্রসন্নেন তবার্জুনেদং রূপং পরং দর্শিতমাত্মযোগাৎ । তেজোময়ং বিশ্বমনন্তমাদ্যং যন্মে ত্বদন্যেন ন দৃষ্টপূর্বম্ ।। ৪৭

ন বেদযজ্ঞাধ্যয়নৈর্ন দানৈর্ন চ ক্রিয়াভির্ন তপোভিরুগ্রৈঃ । এবংরূপঃ শক্য অহং নৃলোকে দ্রষ্টুং ত্বদন্যেন কুরুপ্রবীর ।। ৪৮

মা তে ব্যথা মা চ বিমূঢ়ভাবো দৃষ্ট্বা রূপং ঘোরমীদৃঙ্‌মমেদম্ । ব্যাপেতভীঃ প্রীতমনাঃ পুনস্ত্বং তদেব মে রূপমিদং প্রপশ্য ।। ৪৯

সঞ্জয় উবাচ - ইত্যর্জুনং বাসুদেবস্তথোক্ত্বা স্বকং রূপং দর্শয়ামাস ভূয়ঃ । আশ্বাসয়ামাস চ ভীতমেনং ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুর্মহাত্মা ।। ৫০

অর্জুন উবাচ - দৃষ্ট্বেদং মানুষং রুপং তব সৌম্যং জনার্দন । ইদানীমস্মি সংবৃত্তঃ সচেতাঃ প্রকৃতিং গতঃ ।। ৫১

শ্রীভগবানুবাচ - সুদুর্দর্শমিদং রূপং দৃষ্টবানসি যন্মম । দেবা অপ্যস্য রূপস্য নিত্যং দর্শনকাঙি্ক্ষণঃ ।। ৫২

নাহং বেদৈর্ন তপসা ন দানেন ন চেজ্যয়া । শক্য এবংবিধো দ্রষ্টুং দৃষ্টবানসি মাং যথা ।। ৫৩

ভক্ত্যা ত্বনন্যয়া শক্য অহমেবংবিধোহর্জুন । জ্ঞাতুং দ্রষ্টুঞ্চ তত্ত্বেন প্রবেষ্টুঞ্চ পরন্তপ ।। ৫৪

মৎকর্মকৃন্মৎপরমো মদ্ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ । নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মামেতি পাণ্ডব ।। ৫৫

বাংলা মিনিং

একাদশ অধ্যায়

অর্জুন বলিলেন - তুমি আমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়া যে পরম গুহ্য অধ্যাত্ম-তত্ত্ব বর্ণন করিলে তাহাতে আমার এই মোহ বিদূরিত হইল । ১

হে কমললোচন, ভূতগণের উৎপত্তি ও লয় এবং তোমার অক্ষয় মাহাত্ম্য - এ সকলই তোমার নিকট হইতে সবিস্তারে আমি শুনিলাম । ২

হে পরমেশ্বর, তুমি আপনার বিষয় যাহা বলিলে তাহা এইরূপ বটে; হে পুরুষোত্তম, আমি তোমার সেই ঐশ্বরিক রূপ দেখিতে ইচ্ছা করি । ৩

হে প্রভো ! যদি তুমি মনে কর যে, আমি সেই রূপ দর্শনের যোগ্য, তাহা হইলে হে যোগেশ্বর, আমাকে তোমার সেই অক্ষয় আত্মরূপ প্রদর্শন কর । ৪

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন - হে পার্থ, নানা বর্ণ ও নানা আকৃতিবিশিষ্ট শত শত সহস্র সহস্র বিভিন্ন অবয়ববিশিষ্ট আমার এই অদ্ভূত রূপ দর্শন কর । ৫

হে ভারত (অর্জুন), এই আমার দেহে দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, এবং ঊনপঞ্চাশৎ মরুদ্‌গণ দর্শন কর; পূর্বে যাহা কখনও দেখ নাই, তেমন বহুবিধ আশ্চর্য বস্তু দর্শন কর । ৬

হে নিদ্রাজয়ী অর্জুন, আমার এই দেহে একত্র অবস্থিত চরাচর সমগ্র জগৎ দর্শন কর এবং অপর যাহা কিছু তুমি দেখিতে ইচ্ছা কর, তাহাও এখন দেখিয়া লও । ৭

হে অর্জুন, তুমি তোমার এই চর্মচক্ষুদ্বারা আমার এই রূপ দর্শনে সমর্থ হইবে না । এজন্য তোমাকে দিব্যচক্ষু দিতেছি, তদ্দারা আমার এই ঐশ্বরিক যোগসামর্থ্য দেখ । ৮

সঞ্জয় কহিলেন - হে রাজন্‌ মহাযোগেশ্বর হরি এইরূপ বলিয়া তৎপর পার্থকে পরম ঐশ্বরিক রূপ দেখাইলেন । ৯

সেই ঐশ্বরিক রূপে অসংখ্য মুখ, অসংখ্য নেত্র, অসংখ্য অদ্ভুত অদ্ভুত দর্শনীয় বস্তু, অসংখ্য দিব্য আভরণ এবং অসংখ্য উদ্যত দিব্যাস্ত্রসকল বিদ্যমান (ছিল) । ১০

সেই বিশ্বরূপ দিব্য মাল্য ও দিব্য বস্ত্রে সুশোভিত, দিব্যগন্ধদ্রব্যে অনুলিপ্ত, সর্বাশ্চর্যময়, দ্যুতিমান্‌ অনন্ত ও সর্বতোমুখ (সর্বত্র মুখবিশিষ্ট) (ছিল) । ১১

আকাশে যদি যুগপৎ সহস্র সূর্যের প্রভা উত্থিত হয়, তাহা হইলে সেই সহস্র সূর্যের প্রভা মহাত্মা বিশ্বরূপের প্রভাব তুল্য হইতে পারে । ১২

তখন অর্জুন সেই দেবদেবের দেহে নানা ভাবে বিভক্ত তদীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্বরূপ একত্রস্থিত সমগ্র জগৎ দেখিয়াছিলেন । ১৩

সেই বিশ্বরূপ দর্শন করিয়া ধনঞ্জয় বিস্ময়ে আপ্লুত হইলেন । তাঁহার সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল । তিনি অবনতমস্তকে সেই দেবদেবকে প্রণাম করিয়া করজোরে বলিতে লাগিলেন । ১৪

অর্জুন বলিলেন - হে দেব, তোমার দেহে আমি সমস্ত দেবগণ, স্থাবর জঙ্গমাত্মক বিবিধ সৃষ্ট পদার্থ, সৃষ্টিকর্তা কমলাসনস্থ ব্রহ্মা, নারদ-সনকাদি দিব্য কবিগণ এবং অনন্ত্য-তক্ষকাদি সর্পগণকে দেখিতেছি । ১৫

অসংখ্য বাহু, উদর, বদন ও নেত্রবিশিষ্ট অনন্তরূপ তোমাকে সকল দিকেই আমি দেখিতেছি । কিন্তু হে বিশ্বেশ্বর, হে বিশ্বরূপ, আমি তোমার আদি, অন্ত, মধ্য, কোথাও কিছু দেখিতেছি না । ১৬

কিরীট, গদা ও চক্রধারী, সর্বত্র দীপ্তিশালী, তেজঃপুঞ্জস্বরূপ, প্রদীপ্ত অগ্নি ও সূর্যের ন্যায় প্রভাসম্পন্ন, দুর্নিরীক্ষ্য, অপরিমেয় তোমার অদ্ভূত মুর্তি সর্বদিকে সর্বস্থানে আমি দেখিতেছি । ১৭

তুমি অক্ষর পরব্রহ্ম, তুমি একমাত্র জ্ঞাতব্য তত্ত্ব, তুমিই এই বিশ্বের পরম আশ্রয়, তুমিই সনাতন ধর্মের প্রতিপালক, তুমি অব্যয় সনাতন পুরুষ, ইহাতে আমার সংশয় নাই । ১৮

আমি দেখিতেছি, তোমার আদি নাই, মধ্য নাই, অন্ত নাই, তোমার বলৈশ্বর্যের অবধি নাই, অসংখ্য তোমার বাহু, চন্দ্র সূর্য তোমার নেত্রস্বরূপ, তোমার মুখমণ্ডলে প্রদীপ্ত হুতাশন জ্বলিতেছে; তুমি স্বীয় তেজে নিখিল বিশ্বকে সন্তাপিত করিতেছ । ১৯

হে মহাত্মন্‌, একমাত্র তুমিই স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যস্থল এই অন্তরীক্ষ এবং দিক্‌সকলও ব্যাপিয়া রহিয়াছ । তোমার এই অদ্ভূত উগ্রমূর্তি দর্শন করিয়া ত্রিলোক ব্যথিত হইতেছে । ২০

ঐ দেবতাগণ তোমাতেই প্রবেশ করিতেছেন । কেহ কেহ ভীত হইয়া (জয় জয়, রক্ষ রক্ষ ইত্যাদি বাক্যে) কৃতাঞ্জলিপুটে রক্ষা প্রার্থনা করিতেছেন, মহর্ষি ও সিদ্ধগণ স্বস্তি স্বস্তি বলিয়া উত্তম সারগর্ভ স্তোত্রসমূহদ্বারা তোমার স্তব করিতেছেন । ২১

একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, সাধ্যনামক দেবগণ, বিশ্বদেবগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, ঊনপঞ্চাশ মরুৎ, উষ্মপা (পিতৃগণ), গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর ও সিদ্ধগণ সকলেই বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া তোমাকে দর্শন করিতেছেন । ২২

হে মহাবাহো, বহু বহু মুখ, নেত্র, বাহু, ঊরু, পাদ ও উদর বিশিষ্ট এবং বহু বৃহদাকার দন্ত দ্বারা ভয়ঙ্করদর্শন তোমার এই সুবিশাল মূর্তি দেখিয়া লোকসকল ভীত হইয়াছে এবং আমিও ভীত হইয়াছি । ২৩

হে বিষ্ণো, নভঃস্পর্শী, তেজোময়, বিচিত্রবর্ণ, বিস্ফারিতবদন, অত্যুজ্জল বিশালনেত্র-বিশিষ্ট তোমার রূপ দেখিয়া আমার অন্তরাত্মা ব্যথিত হইতেছে, আমার দেহেন্দ্রিয় বিকল হইতেছে, আমি মনকে শান্ত করিতে পারিতেছি না । ২৪

বৃহৎ দন্তসমূহের দ্বারা ভয়ানকদর্শন, প্রলয়াগ্নি সদৃশ তোমার মুখসকল দর্শন করিয়া আমার দৃষ্টিভ্রম ঘটিতেছে (আমি দিশেহারা হইয়াছি), আমি স্বস্তি পাইতেছি না । হে দেবেশ, হে জগন্নিবাস, প্রসন্ন হও (আমার ভয় দূর কর) । ২৫

(জয়দ্রথাদি) রাজন্যবর্গসহ ঐ সকল ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণ এবং ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ এবং আমাদের প্রধান প্রধান যোদ্ধৃগণ তোমার দংষ্ট্রাকরাল ভয়ঙ্করদর্শন মুখগহ্বরে ধাবিত হইয়া প্রবেশ করিতেছে । কাহারো কাহারো মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া গিয়াছে এবং উহা তোমার দন্তসন্ধিতে সংলগ্ন হইয়া রহিয়াছে দেখা যাইতেছে । ২৬,২৭

যেমন নদীসমূহের বিপুল জলপ্রবাহ সমুদ্রাভিমুখ হইয়া সমুদ্রে গিয়া প্রবেশ করে, সেইরূপ এই মনুষ্য লোকের বীরগণ তোমার সর্বতোব্যাপ্ত জ্বলন্ত মুখগহ্বরে প্রবেশ করিতেছে । ২৮

যেমন পতঙ্গগণ অতি বেগে ধাবমান হইয়া মরণের জন্য জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করে, সেইরূপ এই লোকসকল মরণের নিমিত্তই অতি বেগে তোমার মুখগহ্বরে প্রবেশ করিতেছে । ২৯

তুমি জ্বলন্ত মুখসমূহের দ্বারা লোকসমূহকে গ্রাস করিয়া বারংবার স্বাদগ্রহণ করিতেছ । সমগ্র জগৎ তোমার তীব্র তেজোরাশি-ব্যাপ্ত হইয়া প্রতপ্ত হইয়া উঠিয়াছে । ৩০

উগ্রমূর্তি আপনি কে, আমাকে বলুন । হে দেববর, আপনাকে প্রণাম করি, প্রসন্ন হউন । আদি পুরুষ আপনাকে আমি জানিতে ইচ্ছা করি । আপনি কে, কি কার্যে প্রবৃত্ত, বুঝিতেছি না । ৩১

শ্রীভগবান্‌ কহিলেন - আমি লোকক্ষয়কারী অতি ভীষণ কাল; এক্ষণে এই লোকদিগকে সংহার করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি; তুমি যুদ্ধ না করিলেও প্রতিপক্ষ সৈন্যদলে যে সকল যোদ্ধা অবস্থান করিতেছে তাহারা কেহই থাকিবে না । ৩২

অতএব, তুমি যুদ্ধার্থ উত্থিত হও; শত্রু জয় করিয়া যশঃ লাভ কর, নিষ্কন্টক রাজ্য ভোগ কর । হে অর্জুন, আমি ইহাদিগকে পূর্বেই নিহত করিয়াছি; তুমি এখন নিমিত্ত-মাত্র হও । ৩৩

দ্রোণ, ভীষ্ম, জয়দ্রথ, কর্ণ এবং অন্যান্য যুদ্ধবীরগণকে আমি পূর্বেই নিহত করিয়া রাখিয়াছি, তুমি সেই হতগণকে নিহত কর; ভয় করিও না । রণে শত্রুগণকে নিশ্চয় নিহত করিতে পারিবে, যুদ্ধ কর । ৩৪

সঞ্জয় বলিলেন - শ্রীকৃষ্ণের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া অর্জুন কম্পিত কলেবরে কৃতাঞ্জলিপুটে কৃষ্ণকে নমস্কার করিলে; আবার অত্যন্ত ভীত হইয়া প্রণামপূর্বক গদ্‌গদ স্বরে বলিতে লাগিলেন । ৩৫

অর্জুন কহিলেন - হে হৃষীকেশ, তোমার মাহাত্ম্য-কীর্তনে সমস্ত জগৎ যে হৃষ্ট হয় এবং তোমার প্রতি অনুরক্ত হয়, ইহা যুক্তিযুক্ত; রাক্ষসেরা যে তোমার ভয ়ে ভীত হইয়া চতুর্দিকে পলায়ন করে, এবং সিদ্ধগণ যে তোমাকে নমস্কার করেন, তাহাও আশ্চর্য নহে । ৩৬

হে মহাত্মন্‌, হে দেবেশ, হে জগন্নিবাস, তুমি ব্রহ্মারও গুরু এবং আদি কর্তা; অতএব সমস্ত জগৎ কেন তোমাকে নমস্কার না করিবে । তুমি সৎ (ব্যক্ত জগৎ), তুমি অসৎ (অব্যক্ত প্রকৃতি) এবং সদসতে অতীত যে অক্ষর ব্রহ্ম তাহাও তুমি । ৩৭

হে অনন্তরূপ, তুমি আদিদেব, তুমি অনাদি পুরুষ, তুমি এই বিশ্বের একমাত্র লয়স্থান, তুমি জ্ঞাতা, তুমিই জ্ঞাতব্য, তুমিই পরমধাম ! তুমি এই বিশ্ব ব্যাপিয়া অবস্থান করিতেছ । ৩৮

বায়ু, যম, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র তুমিই; পিতামহ ব্রহ্মাও তুমি এবং ব্রহ্মার জনকও (প্রপিতামহ) তুমি । তোমাকে সহস্রবার নমস্কার করি, আবার পুনঃ পুনঃ তোমাকে নমস্কার করি । ৩৯

তোমাকে সম্মুখে নমস্কার করি, তোমাকে পশ্চাতে নমস্কার করি; হে সর্বস্বরূপ, সর্বত্রই তুমি - তোমাকে সকল দিকেই নমস্কার করি; অনন্ত তোমার বলবীর্য, অসীম তোমার পরাক্রম । তুমি সমস্ত ব্যাপিয়া রহিয়াছ, সুতরাং তুমিই সমস্ত । ৪০

তোমার এই বিশ্বরূপ এবং ঐশ্বর্যমহিমা না জানিয়া, তোমাকে সখা ভাবিয়া অজ্ঞানবশতঃ বা প্রণয়বশতঃ, হে কৃষ্ণ, হে মাধব, হে সখা, এইরূপ তোমায় বলিয়াছি; হে অচ্যুত, আহার, বিহার, শয়ন ও উপবেশনকালে একা অথবা বন্ধুজন সমক্ষে পরিহাসচ্ছলে তোমার কত অমর্যাদা করিয়াছি, অচিন্ত্যপ্রভাব তুমি, তোমার নিকট তজ্জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি । ৪১,৪২

হে অমিতপ্রভাব, তুমি এই চরাচর সমস্ত লোকের পিতা; তুমি পূজ্য, গুরু ও গুরু হইতে গুরুতর; ত্রিজগতে তোমার তুল্য কেহই নাই, তোমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ থাকিবে কি প্রকারে ? ৪৩

হে দেব, পূর্বোক্ত রূপে আমি অপরাধী, সেই হেতু দণ্ডবৎ প্রণামপূর্বক তোমার প্রসাদ প্রার্থনা করিতেছি । সকলের বন্দনীয় ঈশ্বর তুমি; পিতা যেমন পুত্রের, সখা যেমন সখার, প্রিয় যেমন প্রিয়ার অপরাধ ক্ষমা করেন, তুমিও তদ্রুপ আমার অপরাধ ক্ষমা কর । ৪৪

হে দেব, পূর্বে যাহা কখনও দেখি নাই, সেই রূপ দেখিয়া আমার হর্ষ হইয়াছে বটে, কিন্তু ভয়ে মন ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে; অতএব, তোমার সেই (চির পরিচিত) পূর্বরূপটা আমাকে দেখাও; হে দেবেশ, হে জগন্নিবাস, আমার প্রতি প্রসন্ন হও । ৪৫

কিরীটধারী এবং গদা ও চক্রহস্ত তোমার সেই পূর্বরূপই আমি দেখিতে ইচ্ছা করি । হে সহস্রবাহো, বিশ্বমূর্তে, তুমি চতুর্ভূজ মূর্তি ধারণ কর । ৪৬

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন - আমি প্রসন্ন হইয়া স্বকীয় যোগ প্রভাবেই এই তেজোময়, অনন্ত, আদ্য, বিশ্বাত্মক পরমরূপ তোমাকে দেখাইলাম; আমার এই রূপ তুমি ভিন্ন পূর্বে কেহ দেখে নাই । ৪৭

হে কুরুপ্রবীর, না বেদাধ্যয়ন দ্বারা, না যজ্ঞবিদ্যার অনুশীলন দ্বারা, না দানাদি ক্রিয়াদ্বারা, না উগ্র তপস্যা দ্বারা - মনুষ্যলোকে তুমি ভিন্ন আর কেহ আমার ঈদৃশ রূপ দেখিতে সক্ষম হয় নাই । ৪৮

তুমি আমার এই ঘোর রূপ দেখিয়া ব্যথিত হইও না, বিমূঢ় হইও না, ভয় ত্যাগ করিয়া প্রীত মনে পুনরায় তুমি আমার পূর্বরূপ দর্শন কর । ৪৯

সঞ্জয় বলিলেন - বাসুদেব অর্জুনকে এই বলিয়া পুনরায় সেই স্বীয় মূর্তি দেখাইলেন; মহাত্মা পুনরায় প্রসন্ন মূর্তি ধারণ করিয়া ভীত অর্জুনকে আশ্বস্ত করিলেন । ৫০

অর্জুন বলিলেন - হে জনার্দন, তোমার এই সৌম্য মানুষ রূপ দর্শন করিয়া আমি এখন প্রসন্নচিত্ত ও প্রকৃতিস্থ হইলাম । ৫১

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন - তুমি আমার যে রূপ দেখিলে উহার দর্শন লাভ একান্ত কঠিন; দেবগণও সর্বদা এই রূপের দর্শনাকাঙ্ক্ষী । ৫২

আমাকে যেরূপ দেখিলে এই রূপ বেদাধ্যয়ন, তপস্যা, ধ্যান, যজ্ঞ, কোন কিছু দ্বারাই দর্শন করা যায় না । ৫৩

হে পরন্তপ, হে অর্জুন, কেবল অনন্যা ভক্তি দ্বারাই ঈদৃশ আমাকে স্বরূপতা জানিতে পারা যায়, সাক্ষাৎ দেখিতে পারা যায়, এবং আমাতে প্রবেশ করিতে পারা যায় । ৫৪

হে পাণ্ডব, যে ব্যক্তি আমারই কর্মবোধে সমুদয় কর্ম করেন, আমিই যাঁহার একমাত্র গতি, যিনি সর্বপ্রকারে আমাকে ভজনা করেন, যিনি সমস্ত বিষয়ে আসক্তিশূন্য, যাহার কাহারও উপর শত্রুভাব নাই, তিনিই আমাকে প্রাপ্ত হন । ৫৫



Posted by KothaBD.xyz

0 comments:

Post a Comment

 
Top