ষষ্ঠ অধ্যায়
শ্রীভগবানুবাচ - অনাশ্রিতঃ কর্মফলং কার্যং কর্ম করোতি যঃ । স সন্ন্যাসী চ যোগী চ ন নিরগ্নির্ন চাক্রিয়ঃ ।। ১
যং সন্ন্যাসমিতি প্রাহুর্যোগং তং বিদ্ধি পাণ্ডব । ন হ্যসংন্যস্তসঙ্কল্পো যোগী ভবতি কশ্চন ।। ২
আরুরুক্ষোর্মুনের্যোগং কর্ম কারণমুচ্যতে । যোগারূঢ়স্য তস্যৈব শমঃ কারণমুচ্যতে ।। ৩
যদা হি নেন্দ্রিয়ার্থেষু ন কর্মস্বনুষজ্যতে । সর্বসঙ্কল্পসন্ন্যাসী যোগারূঢ়স্তদোচ্যতে ।। ৪
উদ্ধরেদাত্মনাত্মানং নাত্মানমবসাদয়েৎ । আত্মৈব হ্যাত্মনো বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ ।। ৫
বন্ধুরাত্মাত্মনস্তস্য যেনাত্মৈবাত্মনা জিতঃ । অনাত্মনস্তু শত্রুত্বে বর্তেতাত্মৈব শত্রুবৎ ।। ৬
জিতাত্মনঃ প্রশান্তস্য পরমাত্মা সমাহিতঃ । শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু তথা মানাপমানয়োঃ ।। ৭
জ্ঞানবিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা কূটস্থো বিজিতেন্দ্রিয়ঃ । যুক্ত ইত্যুচ্যতে যোগী সমলোষ্টাশ্মকাঞ্চনঃ ।। ৮
সুহৃন্মিত্রার্যুদাসীনমধ্যস্থদ্বেষ্যবন্ধুষু । সাধুষ্বপি চ পাপেষু সমবুদ্ধির্বিশিষ্যতে ।। ৯
যোগী যুঞ্জীত সততমাত্মানং রহসি স্থিতঃ । একাকী যতচিত্তাত্মা নিরাশীরপরিগ্রহঃ ।। ১০
শুচৌ দেশে প্রতিষ্ঠাপ্য স্থিরমাসনমাত্মনঃ । নাত্যুচ্ছ্রিতং নাতিনীচং চৈলাজিনকুশোত্তরম্ ।। ১১
তত্রৈকাগ্রং মনঃ কৃত্বা যতচিত্তেন্দ্রিয়ক্রিয়ঃ । উপবিশ্যাসনে যুঞ্জ্যাদ্ যোগমাত্মবিশুদ্ধয়ে ।। ১২
সমং কায়শিরোগ্রীবং ধারয়ন্নচলং স্থিরঃ । সংপ্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রং স্বং দিশশ্চানবলোকয়ন্ ।। ১৩
প্রশান্তাত্মা বিগতভীর্ব্রহ্মচারিব্রতে স্থিতঃ । মনঃ সংযম্য মচ্চিত্তো যুক্ত আসীত মৎপরঃ ।। ১৪
যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী নিয়তমানসঃ । শান্তিং নির্বাণপরমাং মৎসংস্থামধিগচ্ছতি ।। ১৫
নাত্যশ্নতস্তু যোগোহস্তি ন চৈকান্তমনশ্নতঃ । ন চাতিস্বপ্নশীলস্য জাগ্রতো নৈব চার্জুন ।। ১৬
যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু । যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা ।। ১৭
যদা বিনিয়তং চিত্তমাত্মন্যেবাবতিষ্ঠতে । নিস্পৃহঃ সর্বকামেভ্যো যুক্ত ইত্যুচ্যতে তদা ।। ১৮
যথা দীপো নিবাতস্থো নেঙ্গতে সোপমা স্মৃতা । যোগিনো যতচিত্তস্য যুঞ্জতো যোগমাত্মনঃ ।। ১৯
যত্রোপরমতে চিত্তং নিরুদ্ধং যোগসেবয়া । যত্র চৌবাত্মনাত্মানং পশ্যন্নাত্মনি তুষ্যতি ।। ২০
সুখমাত্যন্তিকং যত্তদ্বুদ্ধিগ্রাহ্যমতীন্দ্রিয়ম্ । বেত্তি যত্র ন চৌবায়ং স্থিতশ্চলতি তত্ত্বতঃ ।। ২১
যং লব্ধ্বা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ । যস্মিন্ স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে ।। ২২
তং বিদ্যাদ্দুঃখসংযোগবিয়োগং যোগসংজ্ঞিতম্ । স নিশ্চয়েন যোক্তব্যো যোগোহনির্বিণ্নচেতসা ।। ২৩
সংকল্পপ্রভবান্ কামাংস্ত্যক্ত্বা সর্বানশেষতঃ । মনসৈবেন্দ্রিয়গ্রামং বিনিয়ম্য সমন্ততঃ ।। ২৪
শনৈঃ শনৈরুপরমেদ্ বুদ্ধ্যা ধৃতিগৃহীতয়া । আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ ।। ২৫
যতো যতো নিশ্চরতি মনশ্চঞ্চলমস্থিরম্ । ততস্ততো নিয়ম্যৈতদাত্মন্যেব বশং নয়েৎ ।। ২৬
প্রশান্তমনসং হ্যেনং যোগিনং সুখমুত্তমম্ । উপৈতি শান্তরজসং ব্রহ্মভূতমকল্মষম্ ।। ২৭
যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী বিগতকল্মষঃ । সুখেন ব্রহ্মসংস্পর্শমত্যন্তং সুখমশ্নুতে ।। ২৮
সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি । ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শনঃ ।। ২৯
যো মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্বং চ ময়ি পশ্যতি । তস্যাহং ন প্রণশ্যামি স চ মে ন প্রণশ্যতি ।। ৩০
সর্বভূতস্থিতং যো মাং ভজত্যেকত্বমাস্থিতঃ । সর্বথা বর্তমানোহপি স যোগী ময়ি বর্ততে ।। ৩১
আত্মৌপম্যেন সর্বত্র সমং পশ্যতি যোহর্জুন । সুখং বা যদি বা দুঃখং স যোগী পরমো মতঃ ।। ৩২
অর্জুন উবাচ - যোহয়ং যোগস্ত্বয়া প্রোক্তঃ সাম্যেন মধুসূদন । এতস্যাহং ন পশ্যামি চঞ্চলত্বাৎ স্থিতিং স্থিরাম্ ।। ৩৩
চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢ়ম্ । তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্ ।। ৩৪
শ্রীভগবান্ উবাচ - অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্ । অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে ।। ৩৫
অসংযতাত্মনা যোগো দুষ্প্রাপ ইতি মে মতিঃ । বশ্যাত্মনা তু যততা শক্যোহবাপ্তুমুপায়তঃ ।। ৩৬
অর্জুন উবাচ - অযতিঃ শ্রদ্ধয়োপেতো যোগাচ্চলিতমানসঃ । অপ্রাপ্য যোগসংসিদ্ধিং কাং গতিং কৃষ্ণ গচ্ছতি ।। ৩৭
কচ্চিন্নোভয়বিভ্রষ্টশ্ছিন্নাভ্রমিব নশ্যতি । অপ্রতিষ্ঠো মহাবাহো বিমুঢ়ো ব্রহ্মণঃ পথি ।। ৩৮
এতন্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুমর্হস্যশেষতঃ । ত্বদন্যঃ সংশয়স্যাস্য ছেত্তা ন হ্যুপপদ্যতে ।। ৩৯
শ্রীভগবান্ উবাচ - পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে । ন হি কল্যাণকৃৎ কশ্চিদ্দুর্গতিং তাত গচ্ছতি ।। ৪০
প্রাপ্য পুণ্যকৃতাং লোকানুষিত্বা শাশ্বতীঃ সমাঃ । শুচীনাং শ্রীমতাং গেহে যোগভ্রষ্টোহভিজায়তে ।। ৪১
অথবা যোগিনামেব কুলে ভবতি ধীমতাম্ । এতদ্ধি দুর্ল্লভতরং লোকে জন্ম যদীদৃশম্ ।। ৪২
তত্র তং বুদ্ধিসংযোগং লভতে পৌর্বদেহিকম্ । যততে চ ততো ভূয়ঃ সংসিদ্ধৌ কুরুনন্দন ।। ৪৩
পুর্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে হ্যবশোহপি সঃ । জিজ্ঞাসুরপি যোগস্য শব্দব্রহ্মাতিবর্ততে ।। ৪৪
প্রযত্নাদ্ যতমানস্তু যোগী সংশুদ্ধকিল্বিষঃ । অনেকজন্মসংসিদ্ধস্ততো যাতি পরাং গতিম্ ।। ৪৫
তপস্বিভ্যোহধিকো যোগী জ্ঞানিভ্যোহপি মতোহধিকঃ । কর্মিভ্যশ্চাধিকো যোগী তস্মাদ্ যোগী ভবার্জুন ।। ৪৬
যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্গতেনান্তরাত্মনা । শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ ।। ৪৭
বাংলা মিনিং
ষষ্ঠ অধ্যায়
শ্রীভগবান্ বলিলেন - কর্মফলে আকাঙ্ক্ষা না করিয়া যিনি কর্তব্য-কর্ম করেন, তিনিই সন্ন্যাসী, তিনিই যোগী । যিনি যজ্ঞাদি শ্রৌতকর্ম ত্যাগ করিয়াছেন অথবা সর্ববিধ শারীরকর্ম ত্যাগ করিয়াছেন, তিনি নহেন । ১
হে পাণ্ডব, যাহাকে সন্ন্যাস বলে, তাহাই যোগ বলিয়া জানিও, কেননা, সঙ্কল্পত্যাগ না করিলে কেহই যোগী হইতে পারে না । ২
যোগে আরোহণেচ্ছু মুনির পক্ষে নিষ্কামকর্মই যোগ-সিদ্ধির কারণ, যোগারূঢ় হইলে চিত্তের শমতাই ব্রাহ্মীস্থিতিতে নিশ্চল থাকিবার কারণ । ৩
যখন সাধক সর্বসঙ্কল্প ত্যাগ করায় রূপরসাদি ইন্দ্রিয় ভোগ্যবিষয়ে এবং কর্মে আসক্ত হন না, তখন তিনি যোগারূঢ় বলিয়া উক্ত হন । ৪
আত্মার দ্বারাই আত্মাকে বিষয়কূপ হইতে উদ্ধার করিবে, আত্মাকে অবসর করিবে না (নিম্নদিকে যাইতে দিবে না) । কেননা, আত্মাই আত্মার বন্ধু এবং আত্মাই আত্মার শত্রু । ৫
যে আত্মাদ্বারা আত্মা বশীভূত হইয়াছে, সেই আত্মাই আত্মার বন্ধু । অজিতাত্মার আত্মা শত্রুবৎ অপকারে প্রবৃত্ত হয় । ৬
জিতেন্দ্রিয়, প্রশান্ত অর্থাৎ রাগদ্বেষাদিশূন্য ব্যক্তির পরমাত্মা শীত-গ্রীষ্ম, সুখ-দুঃখ, অথবা মান-অপমান প্রাপ্ত হইলেও সমাহিত থাকে (অর্থাৎ অবিচলিতভাবে আপন সম-শান্ত-স্বরূপে অবস্থান করে) । ৭
যাঁহার চিত্ত শাস্ত্রাদির উপদেশজাত জ্ঞান ও উপদিষ্ট তত্ত্বের প্রত্যক্ষ অনুভূতির দ্বারা পরিতৃপ্ত, যিনি বিষয়-সন্নিধানেও নির্বিকার ও জিতেন্দ্রিয়, মৃৎপিণ্ড পাষাণ ও সুবর্ণখণ্ডে যাঁহারা সমদৃষ্ট, ঈদৃশ যোগীকে যুক্ত (যোগসিদ্ধ) বলে । ৮
সুহৃৎ, মিত্র, শত্রু, উদাসীন, মধ্যস্থ, দ্বেষ্য, বন্ধু, সাধু ও অসাধু - এই সকলের প্রতি যাঁহার সমান বুদ্ধি, তিনিই প্রশংসনীয় অর্থাৎ তিনি সর্ববিষয়ে সকলের প্রতি রাগদ্বেষশূন্য, তিনিই শ্রেষ্ঠ । ৯
যোগী একাকী নির্জন স্থানে থাকিয়া সংযতচিত্ত, সংযতদেহ, আকাঙ্ক্ষাশূন্য ও পরিগ্রহশূন্য হইয়া চিত্তকে সতত সমাধি অভ্যাস করাইবেন । ১০
পবিত্র স্থানে নিজ আসন স্থাপন করিবে; আসন যেন অতি উচ্চ অথবা অতি নিম্ন না হয় । কুশের উপরে ব্যাঘ্রাদির চর্ম এবং তাহার উপর বস্ত্র পাতিয়া আসন প্রস্তুত করিতে হয়; সেই আসনে উপবেশন করিয়া চিত্ত ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া সংযমপূর্বক মনকে একাগ্র করিয়া আত্মশুদ্ধির জন্য যোগ অভ্যাস করিবে । ১১,১২
শরীর (মেরুদণ্ড), মস্তক ও গ্রীবা সরলভাবে ও নিশ্চলভাবে রাখিয়া সুস্থির হইয়া আপনার নাসাগ্রবর্তী আকাশে দৃষ্টি রাখিবে, এদিক্ ওদিক্ তাকাইবে না; (এইরূপে উপবেশন করিয়া) প্রশান্ত-চিত্ত, ভয়বর্জিত, ব্রহ্মচর্যশীল হইয়া মনঃসংযমপূর্বক মৎপরায়ণ মদ্গতচিত্ত হইয়া সমাধিস্থ হইবে । ১৩,১৪
পূর্বোক্ত প্রকারে নিরন্তর মনঃসমাধান করিতে করিতে মন একাগ্র হইয়া নিশ্চল হয় । এইরূপ স্থিরচিত্ত যোগী নির্বাণরূপ পরম শান্তি লাভ করেন । এই শান্তি আমাতেই স্থিতির ফল । ১৫
হে অর্জুন, কিন্তু যিনি অত্যধিক আহার করেন অথবা যিনি একান্ত অনাহারী, তাঁহার যোগ হয় না; অতিশয় নিদ্রালু বা অতিজাগরণশীলের যোগসমাধি হয় না । ১৬
যিনি পরিমিতরূপ আহার-বিহার করেন, পরিমিতরূপ কর্মচেষ্টা করেন, পরিমিতরূপে নিদ্রিত ও জাগ্রত থাকেন, তাঁহার যোগ দুঃখনিবর্তক হয় । ১৭
যখন চিত্ত বিশেষরূপে নিরুদ্ধ হইয়া আত্মাতেই অবস্থিতি করে, তখন যোগী সর্বকামনাশূন্য হয় । ঈদৃশ যোগী পুরুষই যোগসিদ্ধ বলিয়া কথিত হন । ১৮
নির্বাত-প্রদেশে স্থিত দীপশিখা যেমন চঞ্চল হয় না, আত্মবিষয়ক যোগাভ্যাসকারী সংযতচিত্ত যোগীর অচঞ্চল চিত্তের উহাই দৃষ্টান্ত । ১৯
যে অবস্থায় যোগাভ্যাসদ্বারা নিরুদ্ধ চিত্ত উপরত (সর্ববৃত্তিশূন্য, নিষ্ক্রিয়) হয় এবং যে অবস্থায় আত্মাদ্বারা আত্মাতেই আত্মাকে দেখিয়া পরিতোষ লাভ হয় (তাহাই যোগ শব্দ বাচ্য জানিও) । ২০
যে অবস্থায় ইন্দ্রিয়ের অগোচর, কেবল শুদ্ধ বুদ্ধিগ্রাহ্য যে নিরতিশয় সুখ (আত্মানন্দ) যোগী তাহাই অনুভব করেন এবং যে অবস্থায় স্থিতি লাভ করিয়া আত্মস্বরূপ হইতে বিচলিত হন না, তাহাই যোগশব্দবাচ্য জানিবে । ২১
যে অবস্থা লাভ করিলে যোগী অন্য কোন লাভ ইহার অপেক্ষা অধিক সুখ-কর বলিয়া বোধ করেন না এবং যে অবস্থায় স্থিতি লাভ করিলে মহাদুঃখেও বিচলিত হন না (তাহাই যোগশব্দবাচ্য জানিবে) । ২২
এইরূপ অবস্থায় (চিত্তবৃত্তিনিরোধে) দুঃখসংযোগের বিয়োগ হয়, এই দুঃখ-বিয়োগই যোগশব্দবাচ্য । এই যোগ নির্বেদশূন্য চিত্তে অধ্যবসায় সহকারে অভ্যাস করা কর্তব্য । ২৩
সংকল্পজাত কামনাসমূহকে বিশেষরূপে ত্যাগ করিয়া, মনের দ্বারা (চক্ষুরাদি) ইন্দ্রিয়সমূহকে বিষয় ব্যাপার হইতে নিবৃত্ত করিয়া, ধৈর্য্যযুক্ত বুদ্ধিদ্বারা মন ধীরে ধীরে নিরুদ্ধ করিবে এবং এইরূপ নিরুদ্ধ মনকে আত্মাতে নিহিত করিয়া (আত্মাকারবিশিষ্ট করিয়া) কিছুই ভাবনা করিবে না । ২৪,২৫
মন স্বভাবতঃ চঞ্চল, অতএব অস্থির হইয়া উহা যে যে বিষয়ে ধাবিত হয়, সেই সেই বিষয় হইতে উহাকে প্রত্যাহার করিয়া আত্মাতেই স্থির করিয়া রাখিবে । ২৬
এইরূপ যোগসিদ্ধ পুরুষ চিত্তবিক্ষেপক রজোগুণবিহীন এবং চিত্তলয়ের কারণ তমোগুণ বর্জিত হইয়া ব্রহ্মভাব লাভ করেন, ঈদৃশ প্রশান্তচিত্ত যোগীকে নির্মল সমাধি-সুখ আশ্রয় করে । ২৭
এই রূপে সদা মনকে সমাহিত করিয়া নিষ্পাপ হওয়ায় যোগী ব্রহ্মানুভবরূপ নিরতিশয় সুখ লাভ করেন । ২৮
এইরূপ যোগযুক্ত পুরুষ সর্বত্র সমদর্শী হইয়া আত্মাকে সর্বভূতে এবং সর্বভূতকে আত্মাতে দর্শন করিয়া থাকেন । ২৯
যিনি আমাকে সর্বভূতে অবস্থিত দেখেন এবং আমাতে সর্বভূত অবস্থিত দেখেন, আমি তাহার অদৃশ্য হই না, তিনিও আমার অদৃশ্য হন না । ৩০
যে যোগী সমত্ববুদ্ধি অবলম্বনপূর্বক সর্বভূতে ভেদজ্ঞান পরিত্যাগ করিয়া সর্বভূতস্থিত আমাকে ভজনা করেন, তিনি যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, আমাতেই অবস্থান করেন । ৩১
হে অর্জুন, সুখই হউক, আর দুঃখই হউক, যে ব্যক্তি আত্মসাদৃশ্যে সর্বত্র সমদর্শী সেই যোগী সর্বশ্রেষ্ঠ ইহাই আমার অভিমত । ৩২
অর্জুন বলিলেন - হে মধুসূদন, তুমি এই যে সমত্বরূপ যোগতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিলে, মন যেরূপ চঞ্চল তাহাতে এই সমত্বভাব স্থায়ী হয় বলিয়া আমার বোধ হয় না । ৩৩
হে কৃষ্ণ, মন স্বভাবতঃই চঞ্চল, ইন্দ্রিয়াদির বিক্ষেপজনক মহাশক্তিশালী (বিচারবুদ্ধি বা কোনরূপ মন্ত্রৌষধিরও অজেয়), দৃঢ় (লৌহবৎ কঠিন, অনমনীয়); এই হেতু আমি মনে করি বায়ুকে আবদ্ধ করিয়া রাখা যেরূপ দুঃসাধ্য, মনকে নিরোধ করাও সেইরূপ সুদুষ্কর । ৩৪
শ্রীভবগান্ বলিলেন - হে মহাবাহো ! মন স্বভাবতঃ চঞ্চল, উহাকে নিরোধ করা দুষ্কর, তাহাতে সংশয় নাই । কিন্তু হে কৌন্তেয়, অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা উহাকে বশীভূত করা যায় । ৩৫
অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা যাহার চিত্ত সংযত হয় নাই তাহার পক্ষে যোগ দুষ্প্রাপ্য, ইহা আমারও মত; কিন্তু বিহিত উপায় অবলম্বন করিয়া সতত যত্ন করিলে চিত্ত বশীভূত হয় এবং যোগলাভ হইতে পারে । ৩৬
অর্জুন কহিলেন - হে কৃষ্ণ, যিনি প্রথমে শ্রদ্ধাসহকারে যোগাভ্যাসে প্রবৃত্ত হন, কিন্তু যত্নের শিথিলতাবশতঃ যোগ হইতে ভ্রষ্টচিত্ত হওয়ায় যোগসিদ্ধি লাভে অসমর্থ হন, তিনি কি প্রকার গতি প্রাপ্ত হন ? ৩৭
হে মহাবাহো, তিনি ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপায়ভূত যোগমার্গে অকৃতকার্য হওয়াতে মোক্ষ হইতে বঞ্চিত হন, এবং কাম্য কর্মের ত্যাগহেতু স্বর্গাদি হইতেও বঞ্চিত হন, সুতরাং ভোগ মোক্ষরূপ পুরুষার্থদ্বয় ভ্রষ্ট হইয়া, ছিন্ন মেঘখণ্ডের ন্যায় (মেঘখণ্ড যেমন মূল মেঘরাশি হইতে ছিন্ন হইয়া অপর মেঘরাশি প্রাপ্ত না হইলে মধ্যস্থলে বিলীন হইয়া যায় তদ্রুপ) নষ্ট হন না কি ? ৩৮
হে কৃষ্ণ, তুমি আমার সংশয় নিঃশেষরূপে ছেদন করিয়া দাও, কেননা, তুমি ভিন্ন আমার এই সংশয়ের অপনেতা আর কেহ নাই । ৩৯
শ্রীভগবান্ বলিলেন - হে পার্থ, যোগভ্রষ্ট ব্যক্তির ইহলোকে কি পরলোকে কুত্রাপি বিনাশ নাই । কারণ, হে বৎস, শুভকর্মকারী পুরুষ কখনও দুর্গতি প্রাপ্ত হন না । ৪০
যোগভ্রষ্ট পুরুষ পুণ্যকর্মকারীদিগের প্রাপ্য স্বর্গলোকাদি প্রাপ্ত হইয়া তথায় বহু বৎসর বাস করিয়া পরে সদাচার সম্পন্ন ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন । ৪১
পক্ষান্তরে, যোগভ্রষ্ট পুরুষ জ্ঞানবান্ যোগীদিগের কুলে জন্মগ্রহণ করেন । জগতে ঈদৃশ জন্ম অতি দুর্লভ (যেমন ব্যাসতনয় শুকদেবের) । ৪২
হে কুরুনন্দন, যোগভ্রষ্ট পুরুষ সেই জন্মে পূর্বজন্মের অভ্যস্ত মোক্ষবিষয়ক বুদ্ধি লাভ করেন এবং মুক্তিলাভের জন্য পুনর্বার যত্ন করেন । ৪৩
তিনি অবশ হইয়াই পূর্বজন্মের যোগাভ্যাসজনিত শুভ সংস্কারবশতঃ যোগমার্গে আকৃষ্ট হন । যিনি কেবল যোগের স্বরূপ-জিজ্ঞাসু, তিনিই বেদোক্ত কাম্যকর্মাদির ফল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ফল লাভ করেন (যিনি যোগের স্বরূপ জানিয়া যোগাভ্যাস-পরায়ণ তাঁহার আর কথা কি ?) । ৪৪
সেই যোগী পূর্বাপেক্ষাও অধিকতর যত্ন করেন, ক্রমে যোগাভ্যাসদ্বারা নিষ্পাপ হইয়া বহু জন্মের চেষ্টায় সিদ্ধিলাভ করিয়া পরম গতি লাভ করেন । ৪৫
যোগী তপস্বিগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানিগণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, কর্মিগণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, ইহাই আমার মত; অতএব হে অর্জুন, তুমি যোগী হয় । ৪৬
যিনি শ্রদ্ধাবান্ হইয়া মদ্গতচিত্তে আমার ভজনা করেন, সকল যোগীর মধ্যে তিনিই আমার সহিত যোগে সর্বাপেক্ষা অধিক যুক্ত, ইহাই আমার অভিমত অর্থাৎ ভগবানে ঐকান্তিক ভক্তিপরায়ণ যোগীই শ্রেষ্ট সাধক । ৪৭
Posted by KothaBD.xyz

0 comments:
Post a Comment